বিশ্ব ডেস্ক | মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 109 বার পঠিত

ইরানে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দুই সপ্তাহ ধরে চলছে। বিক্ষোভ দমনে সরকার দেশটিতে ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছে অন্তত ৮৪ ঘণ্টা। বিক্ষোভকারীদের ওপর রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের ঘটনায় ইরানে হামলা করার হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পরই পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দেয় ইরান। দেশটি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, পাশাপাশি সংলাপের দরজাও খোলা রেখেছে। তবে ট্রাম্পের হুমকির কড়া জবাব দিয়েছেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তিনি বলেন, অহংকারীদের উৎখাত করা হবে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে গতকাল সোমবার এসব তথ্য জানানো হয়।
বিক্ষোভে শত শত মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কার কথা জানানো হচ্ছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআরএনজিও) জানায়, ইরানে কমপক্ষে ৬৪৮ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী ৯ জন রয়েছেন। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ১০ হাজার ৬৮১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি। বৃহস্পতিবার থেকে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে ইরান থেকে তথ্যপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক অভিযোগের কারণে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভ ক্ষমতাসীনদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। সমালোচকরা বলছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর দমনপীড়নের মাত্রা আড়াল করতেই ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে।
এএফপি জানায়, তিন দিনের বেশি সময় ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা সংকটের তীব্রতার ইঙ্গিত দেয়। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, মারাত্মক দমনপীড়নের মাত্রা ঢাকতে এই লক্ষ্য নিয়েছে তেহরান। এরই মধ্যে সরকার বিক্ষোভ দমনে দেশব্যাপী সমাবেশের ডাক দিয়েছে। তেহরানের রাস্তায় বড় সমাবেশ লক্ষ্য করা গেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, বিক্ষোভে দমনপীড়নের জন্য ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ গতকাল বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকারি দমনপীড়ন ক্ষমতাসীনদের দুর্বলতার লক্ষণ। কানাডা বলেছে, তারা ইরানের সাহসী জনগণের পাশে আছে।
অত্যাচারী শাসকদের উৎখাত করা হবে: খামেনি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সোমবার সামাজিকমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্পের হামলার হুমকির জবাব দিয়েছেন। ফার্সি ভাষায় তিনি লিখেছেন, ‘যে ব্যক্তি অহংকার ও গর্বের সঙ্গে সেখানে বসে আছে, সমগ্র বিশ্বকে বিচার করছে, সে জেনে রাখুক, এই বিশ্বের অত্যাচারী এবং অহংকারীরা (ফেরাউন, নমরুদ, রেজা শাহ) ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও উৎখাত হয়েছিল; তাকেও উৎখাত করা হবে।’
আলোচনায় বসতে চায় ইরান: ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, তেহরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেওয়ার পরই এই আলোচনার কথা তুলল ইরান। গতকাল ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের নেতারা ফোন করেছেন। একটি বৈঠকের আয়োজন হচ্ছে। তারা আলোচনা করতে চান। তবে বৈঠকের আগেই আমাদের পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলেও হুমকি দেন ট্রাম্প।
যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ইরান
তেহরানে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের এক সম্মেলনে গতকাল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র যুদ্ধ চাইছে না, তবে যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমরা আলোচনার জন্যও প্রস্তুত, তবে এই আলোচনা ন্যায্য, সমান অধিকার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তিনি বলেন, প্রাণঘাতী সহিংসতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাত রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও আরাঘচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে যোগাযোগের একটি চ্যানেল খোলা রয়েছে। প্রয়োজনে বার্তা আদান-প্রদানও করা হয়। তিনি বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কূটনৈতিক উপস্থিতি না থাকলেও সুইস দূতাবাস তাদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।
মর্গের বাইরে কয়েক ডজন মৃতদেহ
ইরানে ৮৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট মনিটরিং সংস্থা মনিটর নেটব্লকস জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার থেকে বড় শহরগুলোতে কাঁপানো গণবিক্ষোভ হলেও ইন্টারনেট থাকা ভিডিও পোস্ট ব্যাপক বাধাগ্রস্ত হয়। রোববার এক ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানের দক্ষিণে একটি মর্গের বাইরে কয়েক ডজন মৃতদেহ জড়ো করা হয়েছে।
নরওয়ে-ভিত্তিক এনজিও ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) জানিয়েছে, অযাচাই করা কিছু সূত্র ইরানের বিক্ষোভে অন্তত ২০০০ জনেরও বেশি লোক নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া দুই হাজার ৬০০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইরানে নিষিদ্ধ বিরোধী দল পিপলস মুজাহেদিন বলেছে, দেশের অভ্যন্তরে তাদের সূত্র অনুসারে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
তেহরানের সমাবেশে সরকারপন্থিদের ঢল
তেহরানের গভর্নর মোহাম্মদ-সাদেগ মোতামেদিয়ান এক বক্তব্যে বলেন, বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সোমবারের তেহরানে একটি সরকারের সমর্থনে বড় বিক্ষোভ মিছিলের ফুটেজ দেখিয়েছে। এ সময় তারা ইসরায়েল মুর্দাবাদ, আমেরিকা মুর্দাবাদ স্লোগান দিচ্ছিল। নিহত কর্মকর্তাদের জানাজা উপলক্ষে হাজার হাজার সরকারপন্থি বিক্ষোভকারী রাস্তায় নামেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তেহরানের এঙ্গেলাব স্কয়ারে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের দেখানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ডাকে অন্যান্য শহরেও একই ধরনের বড় সমাবেশ হয়েছে।
Posted ৭:৩৫ পিএম | মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।